ঘটনার সংক্ষিপ্ত বিবরণ
১০ নভেম্বর ২০২৫, সন্ধ্যা ৬:৫২ মিনিটে দিল্লির ঐতিহাসিক রেড ফোর্ট (লাল কিল্লা) মেট্রো স্টেশনের গেট ১-এর সামনে সুবাষ মার্গ ট্রাফিক সিগন্যালে একটি হুন্ডাই i20 গাড়িতে তীব্র বিস্ফোরণ ঘটে।
প্রাথমিক রিপোর্ট অনুযায়ী কমপক্ষে ৮ থেকে ১৩ জন নিহত এবং ২০–২৪ জন আহত হয়েছেন। বিস্ফোরণের ধাক্কায় আশপাশের ২২টি যানবাহন (৬টি প্রাইভেট কার, ৩টি অটোরিকশাসহ) পুড়ে যায় এবং ৯০০ মিটার দূরের ভবন পর্যন্ত কেঁপে ওঠে।
সাক্ষীদের বর্ণনা অনুযায়ী, বিস্ফোরণের পর আশপাশে দেহের অংশ ছড়িয়ে পড়ে এবং ট্রাফিক সিগন্যালের আশেপাশের রাস্তাগুলো ধোঁয়ায় ঢেকে যায়।
গাড়ির মালিকানা ও সন্দেহভাজনরা
বিস্ফোরণটি ঘটে হরিয়ানা নিবন্ধিত (HR26 CE 7674) হুন্ডাই i20 গাড়িতে।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী:
- গাড়িটি গুরুগ্রামের মোঃ সালমান নামে এক ব্যক্তির নামে নিবন্ধিত।
- তিনি জানিয়েছেন, ১৮ মাস আগে গাড়িটি ওখলার দেবেন্দ্র নামে এক ব্যক্তির কাছে বিক্রি করেন।
- পরে সেটি আম্বালার কারও হাতে যায় এবং শেষপর্যন্ত জম্মু ও কাশ্মীরের পুলওয়ামার তারিক নামের এক ব্যক্তির কাছে বিক্রি হয়—সম্ভবত জাল কাগজপত্র ব্যবহার করে।
এই বহুস্তরীয় মালিকানা পরিবর্তন তদন্তকে জটিল করেছে।
ফরেনসিক সায়েন্স ল্যাবরেটরি (FSL) নমুনা সংগ্রহ করেছে; প্রাথমিকভাবে অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট এবং সম্ভাব্য RDX ব্যবহারের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। তবে কোনো গর্ত বা ধাতব টুকরো না পাওয়ায় তদন্তকারীরা বিস্মিত—ধারণা করা হচ্ছে গাড়িটি চলন্ত অবস্থায় বিস্ফোরিত হওয়ায় বিস্ফোরণ ছড়িয়ে পড়েছে।
ফরিদাবাদে ২,৯০০ কেজি বিস্ফোরক উদ্ধার
ঠিক একই দিনে জম্মু ও কাশ্মীর পুলিশ- হরিয়ানা ও উত্তরপ্রদেশ পুলিশের যৌথ অভিযানে ফরিদাবাদের একটি গুদাম থেকে ২,৯০০ কেজি বিস্ফোরক উপকরণ উদ্ধার করা হয়, যার মধ্যে ছিল ৩৫০ কেজি অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট।
এই ঘটনায় গ্রেপ্তার হয় আটজন, যার মধ্যে তিনজন ডাক্তার (ডা. মুজাম্মিল গানাই, ডা. শাহিন, ডা. আদিল রাদার) ছিলেন।
তদন্তে প্রাথমিকভাবে উঠে এসেছে, তারা জইশ-ই-মোহাম্মদ (JeM) এবং আনসার গজওয়াত-উল-হিন্দ (AGuH)-এর সঙ্গে যুক্ত একটি “হোয়াইট-কলার সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক”-এর অংশ।
রেড ফোর্ট বিস্ফোরণে যে অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট ব্যবহৃত হয়েছে, সেটি ফরিদাবাদে উদ্ধার হওয়া উপাদানের সঙ্গে মিল থাকতে পারে বলে পুলিশ ধারণা করছে, যদিও সরাসরি সংযোগ এখনো নিশ্চিত নয়।
তদন্তের দিকনির্দেশ
- দিল্লি পুলিশের স্পেশাল সেল UAPA-এর ধারা ১৬ ও ১৮ (সন্ত্রাসী কার্যকলাপ ও ষড়যন্ত্র) এবং Explosives Act-এর অধীনে মামলা করেছে।
- পাহাড়গঞ্জ, দরিয়াগঞ্জ ও আশপাশের হোটেলে রাতভর তল্লাশি ও গ্রেপ্তার অভিযান চলছে।
- প্রাপ্ত সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে, সন্দেহভাজন চালক গাড়িতে একা ছিলেন, যা আত্মঘাতী হামলার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেয় না।
- গাড়িটি বিস্ফোরণের আগে প্রায় দুই ঘণ্টা পার্কিং লটে ছিল, যা একটি পরিকল্পিত হামলার ইঙ্গিত হতে পারে।
সন্ত্রাস সংযোগের বিশ্লেষণ
তদন্তকারীরা ঘটনাকে তিনটি সম্ভাব্য দিক থেকে বিশ্লেষণ করছেন:
- পরিকল্পিত আত্মঘাতী হামলা: পুলওয়ামার সন্ত্রাসী মডিউল ভেঙে পড়ায় জড়িত কোনো সদস্য আত্মহত্যার মাধ্যমে হামলা চালিয়ে থাকতে পারে।
- বিস্ফোরক পরিবহনের সময় দুর্ঘটনা: গাড়ি চলন্ত অবস্থায় বিস্ফোরণ ঘটায় এই তত্ত্বও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
- সংযুক্ত সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক: ফরিদাবাদে উদ্ধারকৃত বিপুল বিস্ফোরক যদি একই সোর্স থেকে আসে, তবে এটি একটি বৃহত্তর নেটওয়ার্কের অংশ হতে পারে।
নিরাপত্তা ও প্রতিক্রিয়া
- দিল্লিতে উচ্চ সতর্কতা জারি করা হয়েছে। বিমানবন্দর, রেলওয়ে স্টেশন, মেট্রোসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থানে নিরাপত্তা জোরদার।
- চাঁদনি চক বাজার পরদিন বন্ধ রাখা হয়।
- প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ উভয়েই ঘটনাস্থলের আপডেট ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন।
- অমিত শাহ জানিয়েছেন, “সন্ত্রাসী হামলাসহ সব সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।”
প্রাসঙ্গিক পটভূমি
রেড ফোর্ট বা তার আশপাশে এর আগে ২০০০ ও ২০১১ সালে সন্ত্রাসী হামলা হয়েছিল।
২০২৫ সালের মে মাসে অনুষ্ঠিত “অপারেশন সিন্দুর”-এর পর ভারত–পাকিস্তান সম্পর্কের উত্তেজনা, সীমান্তবর্তী রাজ্যে সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান এবং সম্প্রতি ডাক্তার ও শিক্ষিত শ্রেণির সম্পৃক্ততা—সব মিলিয়ে ভারতের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা পরিস্থিতি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
উল্লেখ্য, একই দিনে ভারতের ‘দি ইকোনোমিক টাইমস’ নিউজ করেছে, ‘লস্কর ই তৈয়বা’র কমান্ডার সাঈফ দাবি করেছেন, হাফিজ সাঈদ বাংলাদেশ থেকে ভারতে আকমণ চালানোর পরিকল্পনা করছে- যা বাংলাদেশের প্রতি আন্তর্জতিক সন্ত্রাসীগোষ্ঠিকে সহযোগিতা করার ইংগিতবাহী। এ খবর সত্যি হলে উপমহাদেশে সন্ত্রাসবাদ ছড়িয়ে পড়ার আশংকা উড়িয়ে দেয়া যায় না।
উপসংহার
রেড ফোর্ট বিস্ফোরণটি নিছক দুর্ঘটনা নয়, বরং পরিকল্পিত সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে ফরিদাবাদে উদ্ধার হওয়া বিস্ফোরক ও রেড ফোর্টের ঘটনার সরাসরি সংযোগ এখনো নিশ্চিত নয়।
তদন্তের পরবর্তী ধাপ নির্ধারণ করবে এটি কি আত্মঘাতী হামলা, নাকি বিস্ফোরক পরিবহনের সময় অনিচ্ছাকৃত বিস্ফোরণ।
যেটাই হোক, এই ঘটনা ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা কাঠামোকে নতুন করে সতর্ক করেছে এবং সন্ত্রাসবাদের ক্রমবিবর্তিত প্রকৃতি—বিশেষ করে শিক্ষিত “হোয়াইট-কালার” অংশগ্রহণ—নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলেছে।

_______________________________________________________
তথ্যসূত্র
- Reuters: “Eight killed in car explosion near Red Fort in India’s Delhi.”
- Associated Press (AP): “Car blast near New Delhi’s historic Red Fort kills at least 8 people.”
- The Guardian: “Eight people die and several injured after car explosion in Delhi, police say.”
- The Times of India, NDTV, Indian Express: ফরিদাবাদে বিস্ফোরক উদ্ধার ও তদন্ত সংক্রান্ত প্রতিবেদন।
- Economic Times / India Today: “J&K police bust inter-state terror module; ~2,900 kg explosives seized in Faridabad.”








Leave a Reply